ফরিদপুরের সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলায় পদ্মা নদীর ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারন করেছে। নদীর ভাঙ্গনে মানচিত্র থেকে মুছে যেতে বসেছে চরাঞ্চলের গ্রামগুলো। বিলীন হয়েছে বসতভিটে-ফসলী জমি, ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে শতাধিক বসতবাড়ি ও ফসলী জমি। নির্ঘুম রাত কাটছে পদ্মা তীরের বাসিন্দাদের। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ভাঙ্গনরোধে ইতিমধ্যেই প্রকল্প প্রনয়ন করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে।
পদ্মা পাড়ে সন্ধ্যা নামছে নিয়ম করেই। নীড়ে ফিরে আসছে পাখিরাও। কিন্তু মানুষ হয়েও নিজেদের ঘরে ফেরার সাহস করতে পারছে না ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আকোটেরচর ইউনিয়নের খালাসিডাঙ্গি গ্রামের বাসিন্দারা। কেউ কেউ ঘরে ফিরলেও ভাঙ্গন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের।
জেলার সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলার পদ্মা নদী বেষ্টিত আটটি ইউনিয়নে পদ্মার ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারন করেছে। গত কয়েকদিনে বিলীন হয়েছে পাকা সড়ক, ফসলী জমি সহ বসতবাড়ি। ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে শতাধিক বসতবাড়ি ও ফসলী জমি। ভাঙ্গনে মানচিত্র থেকে মুছে যেতে বসেছে চরাঞ্চলের গ্রামগুলো।
সরেজমিনে সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলার পদ্মা নদী বেষ্টিত বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহ যাবৎ পদ্মার ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই সদরপুর থেকে পিয়াজখালী কার্পেটিং সড়কের ৫০ হাত নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পাশাপাশি প্রায় আধা কিলোমিটার ফসলি জমি বিলীন হয়েছে। এছাড়া কয়েকটা বাড়িও নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে শতাধিক বসত বাড়ি। অনেককেই বসত বাড়ি সড়িয়ে নিতে দেখা গেছে।
অনেকেরই ফসলী জমি যেটুকু ছিল তা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, আছে শুধুমাত্র মাথা গোঁজার ঠাইটুকু, সেই আশ্রয়স্থলও এখন ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে। নদী তীরের বাসিন্দাদের দাবী ভাঙ্গন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সদরপুর উপজেলার আকোটেরচর ইউনিয়নের খালাসিডাঙ্গি গ্রামের বাসিন্দা কাশেম মোল্যা বলেন, গত এক সপ্তাহে ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারন করেছে। পাকা সড়কের প্রায় ৫০ হাত বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া ফসলী জমিও দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। নদী পাড়ের বাসিন্দারা অনেকেই বসতবাড়ি সড়িয়ে নিয়েছে। ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে শতাধিক বসতবাড়ি ও ফসলী জমি।
আরেক বাসিন্দা আরশাদ বেপারী বলেন, আমাদেরতো যাওয়ার জায়গা নাই, তাই নদী পাড়েই পরে থাকতে হচ্ছে। যাদের টাকা আছে তারা অন্য জায়গায় জমি কিনে চলে গেছে। আমাদের জমি কেনার মতো অর্থ নাই তাই এখানেই থাকতে হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, গত কয়েক বছরে তিন বার বসতবাড়ি সড়িয়েছি। আর কতো বার সড়াবো। আর পারছি না। রাতে ঘরে ঘুমাতে পারিনা। ভয়ে ভয়ে ঘুমাই কখন যেন বসতঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়।
চরভদ্রাসন উপজেলার চর হরিরামপুর ইউনিয়নেও দেখা দিয়েছে নদী ভাঙ্গন। গত এক সপ্তাহে বিলীন হয়েছে ফসলী জমি। কয়েকটি বসতঘরও যেকোন মুহুর্তে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদ খাঁ বলেন, কয়েকদিন যাবৎ নদীর ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারন করেছে। এখনই দ্রুত বাঁধের ব্যবস্থা করা না হলে বিলীন হয়ে যাবে গ্রামটি। সরকারের কাছে দাবী জানাই দ্রুত বাঁধ নির্মাণ করে আমাদের শান্তিতে বসবাস করার ব্যবস্থা করা হোক।
আরেক বাসিন্দা রহিমা খাতুন বলেন, আমরা সরকারের কাছে চাল, গম কিছুই চাই না, আমাদের এই জায়গাটায় বাঁধ দিয়ে দিলেই আমরা খুশি। আমি অন্তত ৫বার আমার বসতবাড়ি সড়িয়েছি, এবারও আবার সড়িয়ে নিতে হবে। যেভাবে ভাঙছে তাতে কয়েকদিনের মধ্যে বাড়িঘর না সরালে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
বিদেশে থাকতেন আয়শা বেগম। দেশে এসে একটি বাড়ী করেন। সেই বাড়িটিও এখন ভাঙ্গনের মুখে। একটি ঘর ইতিমধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে। অন্য ঘরটিও যে কোন সময় নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। ওই ঘর থেকে মালামাল সড়িয়ে নিয়ে নদী পাড়ে রাখা হয়েছে।
আয়শা বেগম বলেন, বিদেশে অনেক কষ্ট করেছি। টাকা জমিয়ে বাড়ি করেছিলাম। এখন একটি ঘর ইতিমধ্যেই নদীতে বিলীন হয়েছে। আরেকটি ঘরও বিলীন হয়ে যাবে। মালামাল সড়িয়ে নিয়েছি। নদী পাড়ে কোনো রকমে ছাপড়া উঠিয়ে রয়েছি। আমার ভাইয়েরও একটি বসতঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অনেকদিন ধরে শুনতেছি বাঁধ হবে কিন্তু কবে হবে তা জানিনা, আমাদের সব শেষ হওয়ার পর বাঁধ হলে কি কাজে লাগবে।
চর হরিরামপুর ইউনিয়নের ছমির বেপারীর ডাঙ্গি গ্রামের বাসিন্দা কাছেদ মিয়া। তিনি বলেন, চরাঞ্চলে আমরা যারা বসবাস করি, তাদের সব সময় রোদ, বৃষ্টি, ঝড় সহ নানা প্রতিকুলতার সাথে লড়াই করে আমাদের বাঁচতে হয়। চরাঞ্চলে আগে কিছুই হতোনা, এখন বাদাম, ভুট্টা সহ সবজি আবাদ করে থাকি। এগুলোর উপরই আমাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। কিন্তু নদী ভাঙ্গনে ফসলী জমি যেভাবে বিলীন হচ্ছে তাতে করে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।
তিনি আরো বলেন, চরাঞ্চলে চাষাবাদ করে শহরে নিয়ে বিক্রি করে থাকি। কিন্তু জমি যদি না থাকে তাহলে আমরা চাষাবাদ করবো কিভাবে, আর সংসার চলবেই বা কিভাবে। সরকারের কাছে দ্রুত বাঁধ নির্মানের দাবী জানাই।
চরভদ্রাসন উপজেলার চর হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: জাহাঙ্গীর কবির বলেন, গত কয়েকদিনে বিলীন হয়েছে ফসলী জমি সহ বসতবাড়ি। ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে শতাধিক বসতবাড়ি ও ফসলী জমি। দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারছেনা নদী পাড়ের বাসিন্দারা। এমনিতেই চরাঞ্চলের মানুষ নানা প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে বসবাস করে তারপর আবার শুরু হয়েছে নদী ভাঙ্গন।
তিনি আরো বলেন, ভাঙ্গনে মানচিত্র থেকে মুছে যেতে বসেছে চরাঞ্চলের গ্রামগুলো। আমার ইউনিয়নটি পদ্মানদী বেষ্টিত। ইতিমধ্যেই গত ৫বছরে ইউনিয়নের অনেকগুলো গ্রাম নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। চরাঞ্চলে যারা বসবাস করে তাদের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে কৃষিকাজ। ফসলী জমি যেভাবে বিলীন হচ্ছে তাতে করে তারা কৃষিকাজও করতে পারবে না। ভাঙ্গনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে একটা সময় বিলীন হয়ে যাবে পুরো ইউনিয়নটি।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: রাকিব হোসেন জানান, জেলার চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলায় পদ্মা নদীর ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই চরভদ্রাসন উপজেলার ভাঙ্গনরোধে প্রকল্প প্রনয়ন করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরো জানান, এছাড়া সদরপুর উপজেলার ভাঙ্গন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে সমীক্ষা শেষ হয়েছে। দ্রুতই প্রকল্প প্রনয়ন করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হবে। অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু করা হবে। এছাড়া জরুরীভাবে ভাঙ্গন কবলিত কিছু স্থানে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।





