spot_img
spot_img

― Advertisement ―

spot_img
Homeঅপরাধ ও অনিয়মঅতিরিক্ত অর্থ ছাড়া মেলেনা ভূমি সেবা যে অফিসে

অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া মেলেনা ভূমি সেবা যে অফিসে

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া মিলছে না কোনো সেবা এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সেবাপ্রত্যাশীরা। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দিনের পর দিন অফিসের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে অনেককেই। এবিষয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দায়ের করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এদিকে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে নেওয়া হবে ব্যবস্থা জানালেন ইউএনও।

জমির নামজারি (মিউট্রেশন), দাখিলা, খতিয়ান, তদন্ত প্রতিবেদন সহ ভূমি সংক্রান্ত যে কোনো কাজ সহজতর করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার, করেছে আধুনিকায়নের সেবার ব্যবস্থা। কিন্তু ব্যতিক্রম চিত্র দেখা গেলো ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা খাজনা আদায়, বা নামজারি প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে মিলছে না কাঙ্খিত সেবা এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

মিউটেশন বা নামজারি করতে সরকারি চার্জ ১হাজার ১শ ৭০ টাকা, অথচ সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে প্রকারভেদে দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ৫০ টাকার দাখিলা করতে নেওয়া হচ্ছে ৫শ টাকা। এমন অভিযোগ চতুল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা’ (তহশিলদার) জহিরুল হকের বিরুদ্ধে। জেলা প্রশাসকের কাছে তহশিলদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

চতুল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া মিলছে না কোনো সেবা এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সেবাপ্রত্যাশীরা। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দিনের পর দিন অফিসের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে অনেককেই। জমির নামজারি, খতিয়ান দেখানো, তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা খাজনা আদায় প্রতিটি ধাপে টাকা না দিলে কাজ হয় না বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

তহশিল অফিসের চার পাশে রয়েছে সেলিম মুন্সি, পান্নু শেখ, জাহিদ ঠাকুর, সাইফার হোসেন, রবিউল ইসলামের কম্পিউটারের দোকানে ভূমি সংশ্লিষ্ট অনলাইনে কাজ সম্পন্ন করা হয় দোকানগুলোতে। এ সকল দোকান থেকেই মক্কেল ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তহশিলদারের কাছে। যেখানে একটি মিউটেশনের সরকারি চার্জ ১১৭০ টাকা, অথচ সেবাগ্রহীতার কাজ থেকে নেওয়া হচ্ছে প্রকারভেদে দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এই দালালদের প্রধান পছন্দ থাকে প্রবাসীদের।

সরেজমিনে তহসিল অফিসের সামনে কথা হয়, জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য আহসান হাবিব, চতুল নিচে বাইখীর গ্রামের নিয়ামুল হক ফয়সাল, বাইখীর চৌরাস্তার মিলন শেখের সাথে। এরা সকলেই জানান, ভূমি অফিসের অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া কোন ফাইল এসিল্যান্ড অফিসে যায় না, তাদের কোন মিউটেশন ৪/৫ হাজার টাকার কমে কাজ সম্পন্ন হয়নি।

ভূমি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত তহসিলদার জহিরুল হকের বিরুদ্ধে এসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শুধু চতুল তহশিল অফিস নয় এমন চিত্র পুরো বোয়ালমারি ইউনিয়ন ভূমি অফিস জুড়ে।

চতুল ইউপির সেবাগ্রহীতাদের দাবি, জহিরুল হক নিজের নিয়ন্ত্রণে কয়েকজন দালাল রেখে সেবা গ্রহীতাদের সাথে কথা বলান। কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি নিজেই অফিসের খরচের কথা বলে অতিরিক্ত অর্থ নেন।

এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় প্রয়াত আশরাফুজ্জামান সাইফার মিয়ার ছেলে এহরামুজ্জামানের সাথে। তিনি বলেন, বাবা মারা গেছে বেশ কিছুদিন হল। বাবার নামে রেকর্ডীয় সম্পত্তি নামজারি করার জন্য গিয়েছিলাম চতুল ভূমি অফিসে। ওই অফিসে ৩-৪ কার্যদিবস যাওয়ার পর তহসিলদার সাহেব বললেন অফিস খরচ না দিলে কিভাবে ফরওয়ার্ডিং হবে। বাধ্য হয়ে এক হাজার টাকা দিয়ে আমার কাজটা আমি করেছি। তারপরও খুশি আমার কাজতো হলো।

গুনবহা ইউনিয়নের চাপলডাঙ্গা থেকে মিউটেশন করতে এসেছেন নাজমুল হোসেন। তিনি সৌদি প্রবাসি, ৮ শতাংশ জমির নিউটেশন করতে সরকারি জমা টাকার বাইরে ১০ হাজার টাকা দিয়েন। তাকে বলা হয়েছে সাত দিনের মধ্যে কাজটি করে দেয়া হবে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে তহশিলদার জহুরুল ইসলাম বলেন, আপনারা যে অভিযোগ বলছেন সেটা সঠিক নয়, এখন অনলাইনে কাজ করা হয় ঘুষ নেওয়ার কোন সিস্টেম নাই। যদি কেউ তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে ঘুষ লেনদেন করে সেই দায় দায়িত্ব আমার নয়।

চতুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, আমার ইউনিয়নের অনেকের কাছ থেকেই উনার (তহশিলদার) সম্পর্কে বিভিন্ন রকম খবর পেয়েছি, তবে আমি নিজে কখনো যাইনি।

ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশন হওয়ার পরেও মানুষের ভোগান্তি বা প্রতারণা মুক্ত কেন হয়নি এ প্রসঙ্গে ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির টিআইবির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শিপ্রা গোস্বামী বলেন, সরকার যেভাবে সংস্কারের মাধ্যমে মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে চান, তৃণমূল পর্যায়ে আসলে সেই ম্যাসেজটি এখনো সেভাবে পৌঁছায়নি। যে কারণেই শত চেষ্টার ফলেও ভূমি ব্যবস্থাপনায় সেবাগ্রহীতার হয়রানি রোধ করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে উপজেলা প্রশাসনেরও সদয় আন্তরিকতা ও কঠোর তদারকি দরকার। তবেই হয়তো আমরা ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবো।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় ফরিদপুরের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব সোহেল রানার সাথে তিনি জানান, বতর্মান সরকার তৃণমুল পর্যায়ে মানুষের সেবা দেয়ার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, তারপরেও এ কাজে যারা বাধা হয়ে দাঁড়াবে প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন গড়ে তুলবো।

ভূমি (তহসিল) অফিসের দুর্নীতি ও হয়রানির প্রসঙ্গে ফরিদপুর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাসানউজ্জামান বলেন, ২৪ এর আন্দোলন একটি পরিবর্তনের জন্য হয়েছে, সেখানে যারা প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়াবে তাদেরকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা উচিত এবং প্রশাসনের যে পর্যায় গুলোতে দুর্নীতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি সেখানে দতারকি হওয়া দরকার। আর এক্ষেত্রে স্থানীয় জনসাধারণেরও সক্রিয় হওয়া উচিত, সরকারের যেসব দপ্তরের দুর্নীতিবাজ লোক রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে সকলকেই।

বোয়ালমারী উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনলাইন সার্ভিস চালু হওয়ার ফলে অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমেছে, তবে অনেকেই এই বিষয়টি ভালোভাবে না বুঝতে পারায় দালালের খপ্পরে পড়ে। তখন তাদের অতিরিক্ত অর্থ নষ্ট হয়। আমরা বলবো সরাসরি এসিল্যান্ড অফিসে আসুন, মিডিল ম্যানের কাছে না গিয়ে।

বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, ভূক্তভোগীরা জেলা প্রশাসক স্যারের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।