মধুমতী নদীর ভাঙনে এ বছর ৬৮ শতাংশ জমি হারিয়েছেন হরেকৃষ্ণ মণ্ডল। এর মধ্যে রয়েছে চারটি বসতঘরও। বাধ্য হয়ে নদীতীরেই অন্যের জমিতে ছাপড়া ঘর তৈরি করে বসবাস করছেন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার শিকারপুর গ্রামের এই বাসিন্দা। এখনও কিছু ফসলি জমি আছে তাঁর। কিন্তু ভাঙনের আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন হরেকৃষ্ণ।
শিকারপুর গ্রামটি উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নে। একই গ্রামের নিজাম উদ্দিন নদীতে হারিয়েছেন ভিটেমাটি। বিলীন হয়েছে তাঁর দুই একর আয়তনের ফসলি জমি। অন্য কোথাও বাড়ি করার মতো জমি কেনার সামর্থ্য নেই নিজামের। এ কারণে পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।
টগরবন্দ ইউনিয়নের শিকারপুর, টিটা পানাইল, কুমুরতিয়া, ইকড়াইল ও টিটা গ্রামের প্রায় অর্ধশতাধিক বাসিন্দা মধুমতীর ভাঙনে বসতঘর হারিয়েছেন। তারা বসবাস করছেন খোলা জায়গায়। রাতের ঘুম একরকম উধাও তাদের। সবার দুশ্চিন্তা ধরা পড়ে হরেকৃষ্ণ মণ্ডলের কথায়। তিনি বলেন, ‘এই বছর যেভাবে নদী ভাঙতাছে, যে ফসলি জমি আছে–সেটা নদীতে গেলে আমরা পরিবার নিয়ে পথে বসে যাব।’
ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে জানা গেছে, মধুমতীর পানি বাড়তে থাকায় ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামে নদীভাঙন তীব্র আকার নিয়েছে। শিকারপুর, টিটা পানাইল, কুমুরতিয়া, ইকড়াইল ও টিটা গ্রামের প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কান পাতলেই ভাঙনের আওয়াজ পাওয়া যায়। ফলে সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকিতে আছেন আরও প্রায় সাড়ে তিনশ পরিবার।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মধুমতীর ভাঙন ঠেকাতে সরকারি কোনো তৎপরতা নেই। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তারা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মহাপরিচালকের কাছে গত ২৬ মে আবেদন করা হয়েছে।
ইকড়াইল গ্রামের বাসিন্দা মনিরুল ইসলামের ভাষ্য, এবার যেভাবে নদীভাঙন শুরু হয়েছে, তা ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ অনেক ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যাবে। অর্ধশত মানুষ ইতোমধ্যে বসতঘর হারিয়েছেন। শত শত একর আবাদি জমি গেছে নদীতে।
এলাকাবাসী জানায়, ইতোমধ্যে ইকড়াইল গ্রামের একটি মসজিদ নদীতে হারিয়ে গেছে। ইকড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন নদীর মাত্র ২০ গজ দূরে। যে কোনো মুহূর্তে সেটি তলিয়ে যেতে পারে। ভয়ে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দিয়েছে।
তাদের ভাষ্য, পাঁচ গ্রামের ১০টি জামে মসজিদ, একটি কলেজ, দুটি হাইস্কুল, চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি দাখিল মাদ্রাসা, একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি সাব পোস্ট অফিস, দুটি বড় হাট, ১০টি মাছ ও গবাদিপশুর খামার, কয়েকটি কাঁচা সড়ক, ঈদগাহ, কবরস্থানসহ শত শত একর ফসলি জমি, গাছপালাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ে আতঙ্কে আছেন।

টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান ইমাম হাচান শিপন বলেন, মধুমতীতে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনও বেড়েছে। এখনই যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে এই অবহেলিত এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।
বর্তমান চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, ভাঙনের বিষয় জানিয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে পাউবো মহাপরিচালকের কাছে ২৬ মে আবেদন করা হয়েছে। সেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে। বিষয়টি তারা উপজেলা প্রশাসনকেও জানিয়েছেন।
পরিদর্শনে কর্মকর্তারা
ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো বুধবার দুপুরে পরিদর্শনে যান ফরিদপুর পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) সন্তোষ কর্মকার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ. কে.এম রায়হানুর রহমানসহ অন্য কর্মকর্তারা।
আলফাডাঙ্গা উপজেলার দায়িত্বে থাকা পাউবো কর্মকর্তা সন্তোষ কর্মকারের ভাষ্য, পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য আজই (বুধবার) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানাবেন। তারা বৃহস্পতিবার ওই এলাকা পরিদর্শনে আসতে পারেন। পরেই ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেবেন।
একই তথ্য জানিয়ে ইউএনও রাসেল ইকবাল বলেন, কয়েকদিনের মধ্যে ভাঙন প্রতিরোধে কাজ শুরু হবে বলে আশা করছেন। যেসব পরিবার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা করবেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক : এম কে বসু
ঠিকানা: পুরাতন বাস স্ট্যান্ড, গোয়ালচামট , ফরিদপুর। যোগাযোগ:faridpurpost24@gmail.com
Copyright © 2026 ফরিদপুর পোস্ট. All rights reserved.